তীব্র মানসিক চাপে করণীয়

তীব্র মানসিক চাপে করণীয়

মানুষের জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে যা মনের উপর প্রচন্ড নেতিবাচক প্রভাব তৈরী করে। আমাদের জীবনে হঠাৎ এমন কিছু মুহূর্ত চলে আসে যা একেবারেই অনভিপ্রেত। হুট করে ঘটে যায় এমন কিছু, যা আমাদের ধারণারও বাইরে। ঠিক সে সময় পরিবর্তিত কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে আমাদের মনোজগতে তৈরি হয় জটিল পরিস্থিতি। ধকল সামলাতে আমাদের চিন্তা-ভাবনা সবকিছু হয়ে পড়ে এলোমেলো। অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি আমরা। আসন্ন বিপদ বা হুমকি থেকে আমাদের মনে তৈরি হয় তীব্র উৎকণ্ঠা আর কোনো ক্ষতি হয়ে গেলে তৈরি হয় বিষন্নতা। আসুন জেনে নিই তীব্র মানসিক চাপে করণীয় সম্পর্কে-

অকস্মাৎ মনের মধ্যে ঘটে যাওয়ার এ অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় ‘অ্যাকিউট স্ট্রেস রিঅ্যাকশন’ বা ‘তীব্র মানসিক চাপজনিত সমস্যা’। এ সমস্যা কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

লক্ষণসমূহঃ

প্রাথমিক অবস্থায় হতবিহ্বল হয়ে পড়া।

দুর্যোগ মুহূর্তটি মনে করতে না পারা বা সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভুলে যাওয়া।

দুর্যোগকে মনে করিয়ে দিতে পারে এমন উদ্দীপনাগুলোকে এড়িয়ে চলা।

হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা বন্ধ হয়ে যাওয়া বা মাত্রাতিরিক্ত অসংলগ্ন কথা বলা।

ঘুম না হওয়া, অতিমাত্রায় টানটান উত্তেজিত থাকা, বুক ধড়ফড় করা, হাত-পা কাঁপা।

পরবর্তী সময়ে এ রোগে আক্রান্তরা নিজেকে গুটিয়ে ফেলতে পারেন, উত্তেজিত আচরণ করতে পারেন বা হয়ে যেতে পারেন অতিরিক্ত কর্মচঞ্চল।

অতিশয় নম্র-ভদ্র ব্যক্তি অপ্রত্যাশিতভাবে অশালীন ভাষা ব্যবহার করতে পারেন।

সবক্ষেত্রে অবশ্য রোগ একইভাবে প্রকাশ পায় না। রোগের প্রকাশ কতটুকু হবে তা প্রতিকূল পরিস্থিতির ধরন এবং পরিস্থিতি আয়ত্ত করার ব্যক্তিগত দক্ষতা বা ‘কোপিং মেকানিজম’-এর ওপর লক্ষণ নির্ভর করে। যাদের প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দক্ষতা কম তারাই তীব্র মানসিক চাপজনিত সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

দুর্যোগ-দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধ করা আলাদা বিষয়; কিন্তু এ দুর্যোগ-দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঘটে গেলে যারা পরিস্থিতির শিকার তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করতে হবে, যাতে তারা নিজেদের করুণার পাত্র মনে না করেন আবার উপেক্ষিত বা ঘৃণিত বোধ না করেন। তাদের সঙ্গে সমবেদী (এমপ্যাথেটিক) আচরণ করতে হবে। ঘটনাটি সম্পর্কে তার সঙ্গে খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করতে হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডিব্রিফিং’,

যা ঘটেছে সেই প্রকৃত ঘটনা তাকে ধীরে ধীরে জানাতে হবে। অহেতুক তাদের ওপর কোনো কিছু জানার জন্য চাপ দেওয়া যাবে না। তাদের আবেগের মূল্য দিতে হবে- তাদের প্রতি সহানুভূতি বা করুণা না দেখিয়ে সাহস দিতে হবে এবং বোঝাতে হবে যে, এ বিপদে আপনি একা নন, আপনার সঙ্গে আমরাও আছি এবং সবাই মিলে নিশ্চয়ই এ বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাব। তাদের ক্ষতি কতটুকু হয়েছে তা নিরূপণ করতে হবে এবং তাকে বোঝাতে হবে যে, তিনি আরও অনেক বড় ক্ষতি থেকে হয়তো বেঁচে গেছেন বা এর চেয়ে আরও বড় ক্ষতি তার হতে পারত।

রিলাক্সেশন, মেডিটেশন

প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হয় সে বিষয়ে ভুক্তভোগীসহ অন্যদেরও কিছুটা প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউন্সিলর বা মনোচিকিৎসকের সহায়তায় বিশেষ কাউন্সিলিং বা সাইকোথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। প্রয়োজনে শুধু মনোচিকিৎসকের পরামর্শে দুশ্চিন্তা প্রশমনকারী (অ্যাংজিওলাইটিক) ও বিষণ্নতা প্রতিরোধী (অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট) ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। রিলাক্সেশন, মেডিটেশন অনেক সময় উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রশিক্ষণ

প্রত্যেক পেশাজীবী এমনকি সাধারণ মানুষদের জন্য নিয়মিত স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। বিশেষত কর্মরত যেসব ব্যক্তি প্রতিনিয়ত মানসিক চাপের মাঝে থাকেন বা যাদের যে কোনো সময় তীব্র মানসিক চাপ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হতে পারে তাদের জন্য এ ধরনের প্রশিক্ষণ থাকা দরকার।